পাতা-১
কবিতা
রচনায় ছন্দের নব প্রকরণ
”মুক্তবৃত্ত ছন্দ”: তত্ত্ব, প্রকরণ ও ভাবের কাব্যিক
স্বাধীনতা
জাফর পাঠান
ভূমিকা
বিবর্তনের বা বাঁক পরিবর্তনের নতুন প্রক্রিয়ায় কবিতা লিখতে
বিদ্যমান ব্যাকরণের ও ছন্দের শিকল বন্দি বাধ্যবাধকতাকে পাশ কাটিয়ে কবিতাকে আরো সহজলব্ধ
ও সহজবোধ্য এবং ভাব প্রকাশের পূর্ণতায় প্রাণবন্ত-আধুনিক ও ছন্দময় করার মানসে কবিতার
নতুন প্রকরণ এই “মুক্তবৃত্ত ছন্দের” আবিস্কার। বিশ্বময় সবকিছুতে নতুন আবিস্কার ও বাক
পরিবর্তনের যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এই নতুন প্রকরণের প্রচলন ।
বাংলা কবিতার ইতিহাসে ছন্দের নানা প্রকরণ বিকশিত হয়েছে- অক্ষরবৃত্ত,
মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দের অনির্দিষ্ট শাখা-প্রশাখা, যেমন: পয়ার,
সনেট, ত্রিপদী, চৌপদী, গৈরিশ ছন্দ, একাবলী ছন্দ, মুক্তক ছন্দ, গদ্যছন্দ, সমিল মহাপয়ার,
অমিল মহাপয়ার, গদ্যধর্মী মুক্তক কিংবা আধুনিক মুক্তছন্দ। প্রতিটি ছন্দই কবিতাকে একটি
নিদ্রিষ্ট কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করেছে ।কিন্তু কবির ভাবনা ও আবেগ অনেক সময় সেই নির্দিষ্ট
ছক অতিক্রম করে
স্বাধীনভাবে প্রবাহিত হতে চায়।সেই ভাব স্বাধীনতার পথকে বিস্তৃত
করতেই কবি জাফর পাঠান প্রবর্তন করেছেন একটি স্বতন্ত্র কাব্য প্রকরণ- “মুক্তবৃত্ত ছন্দ”।
মুক্ত কিন্তু সার্বিক অন্ত্যমিলে বৃত্তাবদ্ধ।
মুক্তবৃত্ত ছন্দের মূল লক্ষ্য হলো- অন্ত্যমিল ও ছন্দের সুর
বজায় রেখে কবিকে ভাব ও পংক্তি বিন্যাসে স্বাধীনতা প্রদান করা । অর্থাৎ এখানে ছন্দের
সংগীত ও মিল থাকবে, কিন্তু ভাব প্রকাশে কোনো কঠোর মাত্রা সংখ্যা, পংক্তি সংখ্যা, যতি
ও বিরাম-বাঁধনে আবদ্ধ থাকবেনা। কিন্তু কবিতার অবয়ব বিন্যাসে লেখকের ইচ্ছা ও সাচ্ছন্দ্যবোধ
অনুযায়ী একটি সমিল ও অন্ত্যমিলের বৃত্ত বা প্রান্ত থাকবে।যেমন: মাত্রাসংখ্যা মিল রেখে-
পংক্তিমিল ২/৩ বা ইচ্ছানুযায়ী হতে পারে।কবিতার অবয়ব সাজাতে স্তবক সংখ্যা নির্বাচন লেখকের
ইচ্ছানুযায়ী।কবিতার পংক্তি সংখ্যাও লেখকের ইচ্ছানুযায়ী অবাধ।
মুক্তবৃত্ত ছন্দের মূলধারণা
মুক্তবৃত্ত ছন্দে কবিতা এমনভাবে রচিত হয় যেখানে ভাব ও ছন্দ
সর্বাগ্রে গুরুত্ব পায়। পংক্তির দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট নয়। যতি ও বিরাম ভাবের স্বাভাবিক
প্রবাহ অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। অন্ত্যমিল বজায় রেখে এবং মাত্রা গণনার নিয়ম সহজ ও সরল
করা হয়েছে । এই কারণে মুক্তবৃত্ত ছন্দে কবি একদিকে ছন্দের সংগীতধর্মিতা বজায় রাখতে
পারবেন, অন্যদিকে ভাবপ্রকাশে অবাধ স্বাধীনতা লাভ করবেন।
মাত্রা গণনার নীতি
আমরা জানি প্রচলিত ছন্দ প্রকরণে মাত্রা দুই প্রকার, যথা: উচ্চারণগত
মাত্রা এবং বর্ণ বা অক্ষরগত মাত্রা।“মুক্তবৃত্ত ছন্দ” প্রকরণে বিদ্যমান মাত্রা সংজ্ঞা,
যেমন- “অক্ষর উচ্চারনের নিম্নতম কাল বা সময়কে এক মাত্রা ধরার” নিয়মকে পাশ কাটিয়ে যে
কোনো বদ্ধাক্ষর ও মুক্তাক্ষরকে এক মাত্রা হিসাবে সর্বদা ধরা হয়েছে, এবং সময় বা কালকে
ধর্তব্যের বাহিরে রাখা হয়েছে।
নবপ্রকরণ “মুক্তবৃত্ত ছন্দে”মাত্রা গণনায় শুধু অক্ষর বা বর্ণ
বা লিপি বিভাগকে মাত্রা গণনার একক হিসাবে ধরা হয়েছে।
পাতা-২
মুক্তবৃত্ত
ছন্দে মাত্রা গণনার পদ্ধতি সরলীকৃত। এখানে বাংলা বর্ণমালার প্রতিটি বর্ণকে একমাত্রা
ধরা হবে । অর্থাৎ যুক্তাক্ষর ও মুক্তাক্ষর উভয়ই একমাত্রা হিসেবে গণ্য হবে ।এছাড়া যেসব
বর্ণ বা চিহ্ন উচ্চারণে স্বতন্ত্র ধ্বনি না হলেও বর্ণ বা অক্ষরের মত স্থান দখল করে,
সেগুলোকেও একমাত্রা হিসেবে গণনা করা হবে। যেমন- ং ও ৎ। এই বর্ণগুলোও লিপি বিভাগ অনুযায়ী পংক্তিতে স্থান
গ্রহণ করে, তাই মুক্তবৃত্ত ছন্দে এগুলিও একমাত্রা ধরা হবে।এই পদ্ধতি মাত্রা গণনাকে
সহজ করে এবং কবিকে জটিল হিসাব থেকে মুক্ত রাখে।তবে এই চিহ্নটি (ঃ) জায়গা দখল করলেও
মাত্রা হিসাবে গণনা হবেনা।
পংক্তির মাত্রা ও দৈর্ঘ্য
মুক্তবৃত্ত ছন্দে পংক্তির মাত্রা সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়।কবি
ভাবের প্রয়োজন অনুযায়ী মাত্রা সংখ্যা বসিয়ে পংক্তি ছোট বা বড় করতে পারবেন।একটি কবিতার
মধ্যে পংক্তির মাত্রা সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে বিষয়ের ভাব সমাপ্তিকে প্রাধান্য দিয়ে।এতে
কবিতার ছন্দধর্মিতা নষ্ট হয়না, বরং ভাব ও ছন্দের প্রবাহ আরও সাবলীল হয়ে ওঠে।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ, মাত্রাবৃত্ত ছন্দ ও স্বরবৃত্ত ছন্দ নামক
ছন্দের তিন প্রকারে যুক্তাক্ষর বা বদ্ধাক্ষরকে বিভিন্ন মাত্রাসংখ্যায় বেঁধে দেয়া হয়েছে,
যেমন কোনটায় একমাত্রা, কোনটায় দুইমাত্রা আবার কোনটায় তিন মাত্রা ।এতে পংক্তির মাত্রা
মিল রেখে ভাব প্রকাশের পূর্ণতা পেতে কষ্ট হয় ।অথচ কবিতায় ভাবপ্রকাশের গভীরতা এবং ছন্দের
অন্ত্যমিল ও পাঠকের সহজবোধ্যতার ওপর কবিতার পরিপক্কতা, গ্রহণযোগ্যতা ও পাঠক প্রিয়তা
নির্ভর করে ।তাই এক্ষেত্রে “মুক্তবৃত্ত ছন্দে” ভাবপ্রকাশের পূর্ণতার জন্য যুক্তাক্ষর
ও মুক্তাক্ষরকে সর্বক্ষেত্রে একমাত্রা ধরা হয়েছে।
যতি, বিরাম, পর্ব
প্রচলিত অনেক ছন্দে যতি-বিরাম বা পর্ব নির্দিষ্ট স্থানে নিয়মবদ্ধ
থাকে ।কিন্তু মুক্তবৃত্ত ছন্দে যতি-বিরাম বা পর্ব পংক্তির যে কোনো স্থানে হতে পারে
এবং তা নির্ধারিত হবে ভাব বিরতির প্রয়োজন অনুযায়ী।এর ফলে কবিতার আবৃত্তিতে নাটকীয়তা
ও আবেগের শক্তি বৃদ্ধি পায়।
ভাবের গভীরতা এবং
বিষয় ও ছন্দের এবং কবিতাকে আবৃত্তিযোগ্য করার লক্ষ্যে যতি-বিরাম বা পর্বকে প্রতি পংক্তিতে
ইচ্ছামত ব্যবহার করা যাবে।
অন্ত্যমিলের বাধ্যবাধকতা
মুক্তবৃত্ত ছন্দে অন্ত্যমিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।কবিতার সংগীতধর্মিতা
ও শ্রুতিমাধুর্যতা রক্ষার জন্য পংক্তি অন্তে অন্ত্যমিল বজায় রাখা প্রয়োজন।অন্ত্যমিলের
মাধ্যমে কবিতায় সুরেলা ধ্বনি, ছন্দের পুনরাবৃত্তি এবং আবৃত্তি যোগ্যতা সৃষ্টি হয়ে শ্রুতিমধুর
ও হৃদগ্রাহী হয়ে ওঠে।
স্তবক বিন্যাস
মুক্তবৃত্ত ছন্দে স্তবক বিন্যাস সম্পূর্ণরূপে লেখকের ইচ্ছাধীন।কবি
চাইলে সমমাত্রিক পংক্তি দিয়ে স্তবক গঠন করতে পারেন, আবার ভিন্নমাত্রার পংক্তি মিলিয়েও
স্তবক সাজাতে পারেন পংক্তিতে পংক্তিতে মাত্রা সমতার ভিত্তিতে। স্তবকের সংখ্যা ও বিন্যাস
কবির সৃজনস্বাধীনতার অংশ।
পংক্তি সংখ্যা
মুক্তবৃত্ত ছন্দে কবিতার পংক্তি সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। কবি
নিজের ভাবের পূর্ণতা প্রকাশের জন্য যত পংক্তি প্রয়োজন মনে করেন, তত পংক্তি ব্যবহার
করে কবিতার অবয়ব সাজাতে পারেন।
পাতা- ৩
ভাব প্রাধান্য
মুক্তবৃত্ত ছন্দের কেন্দ্রবিন্দু হলো ভাব।এখানে ছন্দ হলো ভাবের
অনুসারী, ছন্দের অনুসারী- ভাব নয়। অর্থাৎ ভাবের সমাপ্তি যেখানে, পংক্তির সমাপ্তি সেখানেই
হতে পারে।এই কারণে “মুক্তবৃত্ত ছন্দ” কবিকে একটি স্বতন্ত্র সৃজনমুক্তি প্রদান করে।
উপসংহার
ছন্দ প্রকরণের বিদ্যমান নিয়মে কবিতার পংক্তি সংখ্যা, পর্ব
সংখ্যা এবং মাত্রা সংখ্যাকে ও বিরাম-যতি-পর্ব প্রয়োগকে বেঁধে দেয়া হয়েছে, যা কবিতার
পূর্ণভাব প্রকাশে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে।এক্ষেত্রে “মুক্তবৃত্ত ছন্দে” মাত্রা, পর্ব,
পংক্তি সংখ্যা ও যতি প্রয়োগে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই ।অবাধ স্বাধীনতা থাকায় ভাবকে প্রাধান্য
দিয়ে কবিতাকে ইচ্ছামত টেনে ছোট-বড় করা যায়। তবে যেভাবেই কবিতা লেখা হোকনা কেন পংক্তিতে-পংক্তিতে,
স্তবকে-স্তবকে, মাত্রা প্রয়োগে এবং ছন্দের অন্ত্যমিলে পছন্দমত মিল রেখে ফরমেট ফলো করতে
হবে। ছন্দ কবিতাকে আরো উচ্চমার্গে পৌঁছে দিতে সহায়তা করবে এই ”মুক্তবৃত্ত ছন্দ“প্রকরণ।
বাংলা কবিতার ছন্দতত্ত্ব ক্রমাগত পরিবর্তন-বিবর্তন ও বিকাশের
মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।সেই ধারাবাহিকতায় ”মুক্তবৃত্ত ছন্দ” একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন
করে। এখানে ছন্দের সুরেলা ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে কবিকে দেওয়া হয়েছে ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা।এই
প্রকরণে কবিতা একদিকে হয়ে ওঠে হিন্দোলিত-কল্লোলিত-অলংকৃত ও সংগীতময়, অন্যদিকে মুক্ত।
অতএব, মুক্তবৃত্ত ছন্দ কেবল একটি ছন্দ পদ্ধতি নয়, বরং এটি
কবির সৃজন স্বাধীনতার এক নতুন কাব্য দর্শন।যা কবিতাকে তার স্বকীয় আত্মমর্যাদায় ফিরিয়ে
আনতে ও হারানো জনপ্রিয়তা ও পাঠকপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে এবং নবপ্রজন্মকে
কবিতার প্রতি ফের আকৃষ্ট করবে এবং কবিতা সংজ্ঞাভিত্তিক তার স্বকীয়তা ফিরে পাবে।
যেখানে নেই ব্যাকরণের হাত-পা বন্ধন
আছে শুধু কাব্যপ্রাণ ছন্দ বুনন স্পন্দন
তার নাম ‘মুক্তবৃত্ত ছন্দ’ ভিন্ন প্রকরণ।।